শনিবার । ৯ই মে, ২০২৬ । ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মানবতার সংকট : গুজরাট থেকে পশ্চিমবঙ্গ

কামরুল ইসলাম

ভারতবর্ষ বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠা একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র। এই বৈচিত্র্যই দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু যখন রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই শক্তিই পরিণত হয় বিভাজন ও সংঘাতের কারণ হিসেবে। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানের সময়কার ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা এবং পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাগুলো নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে-ধর্ম কি মানুষের জন্য, নাকি রাজনীতির অস্ত্র?

গুজরাট দাঙ্গা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ঃ

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের গুজরাট রাজ্যের গোধরায় একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে করসেবক বহনকারী একটি বগিতে বহু মানুষ নিহত হন। এই ঘটনার পর পুরো গুজরাটজুড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় এক হাজার মানুষ নিহত হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল, যাদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

ঐ সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ অভিযোগ তোলে যে প্রশাসন দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বহু এলাকায় সহিংসতা দিনের পর দিন চলতে থাকে। নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং গণহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসে। ঐসব ঘটনার নেপথ্যে মূখ্যমন্ত্রীর উসকানি ভূমিকা ছিল বলে অভিজ্ঞজনের মনে করেন। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হয়। বিশেষ তদন্ত দল বা এসআইটি মোদির বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায়নি বলে উল্লেখ করে। তবে সমালোচকদের মতে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক পরিবেশ দাঙ্গাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। ফলে গুজরাট দাঙ্গা আজও ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক উত্তেজনাঃ

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় মিছিল, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক উসকানিকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের ঘটনাও ঘটে। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দায়ী করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতের ঐতিহ্যগত সম্প্রীতি কি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে ধর্মীয় সহাবস্থানের উদাহরণ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব, নির্বাচনী মেরুকরণ এবং ধর্মভিত্তিক প্রচারণা রাজ্যের সামাজিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের সমর্থন বাড়াতে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগাচ্ছে—এমন অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়।

রাজনীতি যখন বিভেদের হাতিয়ারঃ

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কখনোই হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, উসকানি, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক বৈষম্য। যখন নেতারা দায়িত্বশীল ভাষার পরিবর্তে বিভাজনের ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিদ্বেষ বাড়তে থাকে।

ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস বলে- ধর্মীয় সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। ঘর হারায় দরিদ্র পরিবার, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় শিশু, আর অর্থনীতি পড়ে অনিশ্চয়তায়। অথচ রাজনৈতিক লাভ পায় কিছু গোষ্ঠী মাত্র।

মানবিক মূল্যবোধই হতে পারে সমাধানঃ

গুজরাট হোক বা পশ্চিমবঙ্গ-প্রত্যেক সাম্প্রদায়িক সংঘাত আমাদের শেখায় যে ঘৃণা কখনো স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবার দায়িত্ব হলো সংযম, সত্যনিষ্ঠা ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো।

পশ্চিম বাংলার প্রভাব বাংলাদেশের উপর না পড়ুকঃ

পশ্চিম বাংলায় সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান হয়ে সরাসরি ও স্বঘোষিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা হতে চলেছে। সেই সাথে কেন্দ্রীয় সাম্প্রদায়িক সরকারের সমর্থন থাকছে। এখন যদি নতুন সরকারের নেতারা নির্বাচনের পূর্বে যেমন কথাবার্তা বলতেন, ক্ষমতায় বসার পর তেমন আচরণ করলে মারাত্মক সংঘাতের আশংকা আছে। আল্লাহ না করুক, এমন কিছু হলে বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। অতএব আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে।

ধর্ম মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য, বিভাজনের জন্য নয়। যদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস করে ফেলে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পু‌লিশ কর্মকর্তা

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন